Monday, March 25, 2024

বাহা বঙ্গা



বাহা রেগে জানাম তাবন 
বাহা রেগে জাতি 
সারি লো সারি সারজম বাহা বুটৌরে 
অনা তেড়ং বাহা গেবন বঙ্গা লাহায়া !

সাঁওতালিতে বাহা শব্দের অর্থ হলো ফুল। বাহা বঙ্গা হলো সাঁওতালদের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎসব। সাঁওতালদের বছর শুরুর পর প্রথম উৎসবও বলা যেতে পারে। সাধারণত ফাল্গুন মাসের ফাগুন কুনমির পঞ্চমী তিথি থেকে পরবর্তী পূর্ণিমা পর্যন্ত বাহা উৎসব হয়ে থাকে, যদিও কিছু ক্ষেত্রে পূর্ণিমার পরেও বাহা উৎসব পালিত হয়।
চারিদিকে এসময়ে গাছে গাছে লাল পলাশের মেলা, শাল গাছেও থোকা থোকা ফুলে ভর্তি, মহুয়ার ডালগুলো সব কুঁড়িতে ভরপুর, চারিদিকে নতুনের আগমন। 
বাহা পরব না হওয়া পর্যন্ত সাঁওতালরা নূতন ফলমূল খান না, এছাড়া নতুন পাতার থালাতেও অন্ন গ্রহণ করেন না। সাঁওতাল মাঝি এবং নায়কেরা এই রীতিনীতি অত্যন্ত কঠোর ভাবে পালন করেন।
বাহা বঙ্গা মূলত-- জাহের আয়ো, মারাং বুরু, মড়েক তুরুই ক, সিঞ বঙ্গা বা সিঞ চাঁদ, গোঁসাই এরা, সিমা সাঁড়ে- এনাদের উদ্দেশ্যে পূজা নিবেদন করা হয়। জাহের থানে এনাদের কাছে পরিবারের এবং গ্রামের সকলের শান্তি ও মঙ্গল কামনা সহ ভালো চাষবাস এবং গৃহপালিত পশুদের রোগজ্বালা থেকে মুক্ত থাকার জন্য প্রার্থনা করা হয়। শাল গাছে ঘেরা পবিত্র একচালা খড়ের ঘরের তৈরি কাঠামো ও তার পারিপার্শ্বিক স্থান হল জাহের থান।
এই বাহা বঙ্গা টানা তিন দিন ধরে চলে। প্রথম দিন উম্ মাহা, দ্বিতীয় দিন সারদি মাহা আর তৃতীয় দিন বাহা বাস্কে।
প্রথম দিন অর্থাৎ উম্ মাহাতে গ্রামের সাঁওতাল পুরুষরা সাড়িম্ দাপ্ অর্থাৎ খড়ের চালা বানানো এবং আনুষঙ্গিক ক্রিয়াদি সম্পন্ন করেন। একটি জাহের এরা, মারাং বুরু, মড়েক তুরুই ক, ধরম গোঁসাই, সিঞ বঙ্গা এবং অন্যটি গঁসাই এরা এর জন্য। 
সিঞ বোঙ্গা হল সূর্য দেবতা এবং সাঁওতালদের পুরা কথা অনুযায়ী মড়েক হল পৃথিবীর সৃষ্টির সময় পিলচু হাড়াম-পিলচু বুড়ির পর পর পাঁচ জোড়া পুত্র ও কন্যা সন্তান এবং ষষ্ঠতম বারে এক কন্যা হলো তুরুই ক।
নায়কে বা পুরোহিতরা জাহের থানে গোবর দিয়ে লেপন করেন এবং এরপর বঙ্গা সাপাব বা ঠাকুরের অস্ত্র সহ স্নান করতে যান। পূজার যাবতীয় সামগ্রী খুব ভালো করে কোন জলাশয় বা নদীতে ধুয়ে নেন এবং নিজেও স্নান করেন। সহযোগী হিসাবে মাঝি, জগ মাঝি, গডেৎ, পারাণিক এনারাও থাকেন (গ্ৰামের মোড়লদের বিভিন্ন পদ এর নাম)। ফিরে এসে এই পূজার সামগ্রী গুলোতে মেথি ও সরষের তেল মাখানো হয় এবং জাহেরেও দেবতাদের উদ্দেশ্য করে সরষের তেল মাখানো সিঁদুর এর টিকা বা ছাপ দেওয়া হয়। শুধুমাত্র ধরম গোঁসাইকে তেল ছাড়া সিঁদুরের টিকা দেওয়া হয়।
নায়কে সহ যারা ছাউনি বানানোর কাজে নিযুক্ত ছিলেন তারা এরপর নায়েকের বাড়িতে আসেন। নায়কে তাদের খাওয়া-দাওয়ার বন্দোবস্ত করেন।
গডেৎ সেই দিনই বাড়ি বাড়ি চাল ও ছোট মুরগি সংগ্রহ করেন। রাত্রিবেলা নায়কের উঠানে দেবতাদের আহ্বান করা হয়। দেবতা মানুষের মধ্যে ভর করে- কেউ মারাং বুরু, কেউ জাহের আয়ো, কেউ মড়েক তুরুই ক হয়। তারা নিজেদের সাপাব বা অস্ত্র নিয়ে জাহের থানে যায়। তারই সঙ্গে সঙ্গে গ্রামের বাকী পুরুষরাও সেখানে যায়। জাহের আয়ো জনঃ বা ঝাঁটা দিয়ে জাহের থান পরিষ্কার করে আর মারাংবুরু মড়েক তুরুই ক যাচাই করে সমস্ত আয়োজন বা পরিবেশ ঠিকঠাক আছে কিনা এবং যারা তাদের সঙ্গে যায় ওনাদেরকে জিজ্ঞেস করে যে সমস্ত কিছু ঠিকঠাক আছে কিনা। তারপর তারা আবার নায়েকের বাড়ির উঠানে ফিরে আসে। নায়কে তাদের সাপাব গুলো তাদের থেকে নেয়, তারপর নায়কে এরা বা নায়কের বউ তাদের পা ধুইয়ে দেয় আর তারাও নায়কে আর নায়কে এরার পা ধুয়ে দেয় ও মাথায় জল দেয়।
এরপর নায়েকে আর নায়কে এরা তিনজনকে বসতে দেয়। বসার পরে এই তিনজনকে ওনারা কুলো আর আতপ চাল দেন। এরই সঙ্গে তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় যে সমস্ত কিছু ঠিকঠাক আছে কিনা এবং গ্রামে রোগজ্বালা যাতে না হয়, ফলন যেন ভালো হয় এবং শান্তি বজায় থাকে তার কামনা করা হয়। ওনাদের কাছে মঙ্গল কামনা করার পরে তাদের কপালে সিঁদুরের টিকা দিয়ে ওনাদের শান্ত করা হয়। তারপর গ্রামের মহিলারা জাতুর বা বাহার বিশেষ নৃত্য শুরু করেন এবং পুরুষরা টামাক, তুং দাঃ সহ সাকোয়া (যথাক্রমে ধামসা, মাদল ও মোশের শিঙের তৈরী বাঁশি বিশেষ) বাজান।  নৃত্য সম্পন্ন হলে উপস্থিত সকলকে নায়েকের বাড়িতে খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা হয় এবং নায়কে ও নায়কে এরা সেই রাত্রে মাটিতে চাটাই পেতে শায়িত হন।
বাহা বঙ্গা বা উৎসবের দ্বিতীয় দিন সারদি মাহা। সেদিনও সকালে নায়কে অবিবাহিত দুজন পুরুষকে নিয়ে নদীতে বা পুকুরে বঙ্গা সাপাব সমেত স্নান করতে যান। এই অবিবাহিত দুজন সাঁওতাল পুরুষ ছোট কলসিতে জলাশয় থেকে জল নিয়ে আসে। জাহের থানের দুপাশে জলভর্তি কলসি রাখা হয় এবং বৗরছি হাপা (শাবল বিশেষ) ও তীর ধনুক শাল গাছের গোড়ায় ঠেকানো হয় বা পোতা হয়। এরপরে নায়কের সঙ্গে তারাও নায়কের বাড়িতে আসেন এবং নায়কে উখুড় (কাঠের তৈরি অত্যন্ত ছোট্ট ঢেঁকি বিশেষ) দিয়ে হলং বা আতব চালগুড়ি তৈরী করে জাহেরে খন্'ড্ তৈরীর জন্য। তারপর উঠানে পূজার সামগ্রী জোগাড় করা হয় যেমন তেল, সিন্দুর, ধুনো, ঘটিজল, মেথি, লাতি সুতৌম (বিশেষ ধরনের সাদা পাতলা সুতো), বৗরছি হাপা তীর-ধনুক, ঝাঁটা, সিকড়ি মুদম্ (লোহার শেকলের মালা) ইত্যাদি বের করে উঠোনে রাখা হয় এবং মাঝি বাবা ও গ্রামের মোড়লরা সেগুলো সমস্ত কিছু ঠিকঠাক আছে কিনা দেখে নেন, তারপর নায়কে সেগুলোকে মাথায় নিয়ে হাতে ঘটি জল নিয়ে জাহেরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। সাথে গ্রামের মহিলা ও পুরুষরা নাচের মাধ্যমে তাঁকে জাহের থানে পৌঁছে দেন। জাহের থানে পৌঁছানোর পরে পুজোর আগে নায়কে জলভর্তি কলসি, তীর-ধনুক, বৗরছি হাপা এগুলো নিয়ে শালগাছকে কেন্দ্র করে লাতি সুতোম দিয়ে জড়ানোর মাধ্যমে তিনপাক ঘোরেন। এরপরে নায়কে পুজো দিতে বসেন।
পুজো প্রথমে জাহের আয়োকে সমর্পণ করা হয়। তারপরেই পর্যায়ক্রমে মারাংবুরু, ধরম গোঁসাই, মড়েক তুরুই ক, সিঞ বঙ্গা ও গোঁসাই এরাকে পুজো দেওয়া হয়। সর্বশেষে সীমানা যাতে ঠিকঠাক থাকে সেই জন্য কুডৗম্ নায়কে সীমৗ সাড়ে বঙ্গা করে। কুডৗম্ নিজের রক্ত উৎসর্গ করে এবং শালপাতাকে উল্টো রেখে বাম হস্তে পুজো সম্পন্ন করে।
নায়কের পুজো শুরু করার আগেই ছেলেরা শাল, মহুয়া, পলাশ ইত্যাদির কচিপাতা ও ফুল, কুড়ি, মুকুল ইত্যাদি সংগ্রহ করে আনে এবং সেগুলি পুষ্প স্বরূপ দেবতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়ে থাকে। নায়কে যখন একদিকে পূজা সম্পন্ন করতে থাকেন অন্যদিকে ছেলেরা খিচুড়ি ভোগ তৈরি করতে থাকে।
এরপরে পূজা শেষে খিচুড়ি ভোগ খাওয়ার পর পুরুষ ও মহিলারা নায়েকের কাছ থেকে আশীর্বাদ নেয়। পুরুষরা দু'হাত পেতে ও মহিলারা শাড়ির আঁচলে পুজো করা শালফুল ও অন্যান্য ফুলের মুকুল নায়েকের থেকে নেয়। এরপর জাহেরের শাল গাছ ও ছাউনিকে কেন্দ্র করে নাচ শুরু হয় মাদলের তালে তালে। বেশ দীর্ঘক্ষন ধরে চলতে থাকে এই নাচের পর্ব।
সন্ধ‍্যের কাছাকাছি মাঝি বা "নায়কে এরা" সমস্ত বঙ্গা সাপাব গুলো সংগ্রহ করেন এবং নায়কে বাকী পূজা সামগ্রী গুটিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেন। সাথে সাথে ছেলেমেয়েরা তার পিছনে তুং দাঃ টামাকের তালে তালে নাচ-গান করতে করতে যায়। বাহাতে সাকোয়া অবশ্যই একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অনিবার্য বাদ্যযন্ত্র।গ্রামে পৌঁছানোর পর প্রতিটা বাড়ির মহিলারা নায়কের এবং অবিবাহিত দুজন পুরুষদের পা ধুয়ে দেন।সম্পর্ক অনুসারে আশীর্বাদ দেওয়া অথবা নেওয়া হয় এবং আঁচলে বাহা বঙ্গা দিয়ে গায়ে জল ঢালা হয়।
এই ভাবে গ্ৰামের প্রত্যেকটি বাড়িতে যাওয়ার পর নায়কে নিজের বাড়িতে আসেন। এই সমগ্র প্রক্রিয়ার মধ্যে অবিরাম নাচ-গান চলতেই থাকে। নায়কে নিজের বাড়িতে গেলে নায়কে এরা তাকে ও অবিবাহিত দুজন পুরুষকেও বাড়ির বাইরে পা ধুইয়ে দেন। তারপর নায়কে ঘরে ঢুকে ঘটির জল ঘরের চালে ছেটান। অবিবাহিত দুজন পুরুষের কলসির মধ্যে যে জল থাকে সেটিকে অত্যন্ত সুরক্ষিত জায়গায় রাখা হয়।পরবর্তী ক্ষেত্রে সেই জল বিভিন্ন শুভ কাজে এবং ওষুধ হিসাবে ব্যবহার করা হয়।
এরপরে নায়কের রাচা বা উঠোনেই সারারাত নাচ গান করে সেই দিনের মত অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।
পরের দিন অর্থাৎ তৃতীয় দিন বাহা বাস্কে। সেদিনও গ্রামে নাচ-গান হয় আর জল ঢালার খেলা তালে তালে চলতে থাকে।বর্তমানে হোলি হিসেবে যেমন আবির বা রং খেলা ব্যবহার হয় তেমনটি নয়। কেবল জল ঢেলেই এই খেলায় মেতে ওঠে গ্রামের সকল মানুষ।
এইভাবে নাচ-গান, জল খেলা ও পূজা অর্চনার মধ্যে দিয়েই বাহা পরবের সমাপ্তি ঘটে।
সাঁওতালদের কাছে বাহা বঙ্গা কেবল একটা উৎসব নয়, ধর্মীয় অনুশাসন ও অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সকল মানুষের মিলন উৎসবও বটে। সাঁওতালদের বিভিন্ন গ্রামে গ্ৰামে এখন চলছে বাহা পরবের অনুষ্ঠান।

No comments:

Post a Comment

Home

WELCOME