ঐতিহাসিক সান্তাল 'হুল' বা সাঁওতাল বিদ্রোহ
1855 সালের 30 জুন মহান সান্তাল হুল সংঘটিত হয়েছিল,
এই হুল বা বিদ্রোহের প্রধান কারণ ছিল ইংরেজ ও তাদের অনুগত সুদ খোর, মহাজন , দাদন ব্যবসায়ী, পুলিশ দারোগার অকথ্য শোষণ অত্যাচার নির্যাতন ইত্যাদি,
এই বিদ্রোহের অন্যতম কারণ হিসাবে 1852 সালের লর্ড কর্ণওয়ালিসের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলকেও দ্বায়ী করা হয়,
এই বিদ্রোহ স্থায়ী কাল ছিল 1855 সালের 30 জুন থেকে 1856 সালের নভেম্বর মাস পর্যন্ত, এই আঠারো মাস |
সেই সময় সুদখোর মহাজন ও দাদন ব্যবসায়ীদের শোষণ ও ঠকবাজিতে সাঁওতাল জনজাতি নিঃস্ব হয়ে পড়েছিল, মহাজনের ঋণ যতই ফেরত দিক কখনোই তা শোধ হতো না, বংশ পরম্পরায় পরিশোধ করতে হতো ,
ঋণ পরিশোধের নামে স্ত্রী পুত্রকে সারাজীবন গোলাম করে রাখতো, পুলিশের সহায়তায় তারা সাঁওতালদের গরু ছাগল কেড়ে নিতো, জমি কেড়ে নিতো, প্রতিবাদ করলে গ্রেপ্তার করে কারাগারে আটকে রাখতো,
ইংরেজ সরকারের কাছে প্রতিকার চাইলে উল্টো অত্যাচারের খাড়া তাদের উপরি নেমে আসতো,
এই অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে সিধু মুর্মু এবং কানু মুর্মু তাদের নিজ গ্রাম বীরভূমের ভাগনাডিহিতে এক জন সমাবেশের ডাক দিয়েছিলেন,
সিধু,কানু , চাঁদ, ভাইরো এই চার ভাই সাঁওতাল সমাজের ঐতিহাসিক পদ্ধতিতে সাল গাছের ডাল কাঁধে নিয়ে দামিন-ই-কোহ এলাকার চার শতাধিক গ্রামে গণ সমাবেশের আহ্বান জানিয়ে প্রচার করে, ফলে দুর্গম গহীন বনাঞ্চল হওয়া সত্বেও 30 হাজার মতান্তরে 50 হাজারেরও অধিক সাঁওতাল সমাজের লোক জমায়েত হয়েছিল,
এই বিদ্রোহ হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ ও বিহারের ভাগলপুর জেলায়,
এই সাঁওতাল বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে প্রথম সংঘঠিত সংগ্রাম,
যুদ্ধে ইংরেজ সৈন্য সহ দশ হাজার যোদ্ধা মৃত্যু বরণ করেছিল, সাঁওতাল বিদ্রোহ ব্রিটিশ সরকারের মসনদ কাঁপিয়ে দিয়েছিলো,
যুদ্ধে সিধু, কানু , চাঁদ, ও ভাইরো পর্যায়ক্রমে নিহত হলে যুদ্ধ শেষ হয় ও বিদ্রোহের সমাপ্তি ঘটে
ফলাফল
সাঁওতাল জাতির ইতিহাসে সিধু কনুর নেতৃত্বে সাঁওতাল বিদ্রোহী ছিল সর্বাধিক বৃহত্তম ও গৌরবের বিষয়, তাদের এই বদ্রোহেই ভারতবর্ষে স্বাধীনতার বীজ বপন করে দিয়েছিলো,
এই যুদ্ধের ফল হিসাবে ইংরেজ সরকার সাঁওতালদের অভিযোগ সম্পর্কে তদন্তের ব্যবস্থা করেছিলেন, ম্যাজিস্ট্রেট এডন সাহেব সাঁওতালদের আবেদন শুনলেন, যুদ্ধের পর সাঁওতালদের সমস্যা বিবেচনা করে আদিবাসী সাঁওতালদের জন্য একটি জেলা বরাদ্দ করেছিল যা এখনো সাঁওতাল পরগনা নামে বিদ্যমান,
এই বিদ্রোহের উল্লেখযোগ্য দিক
1855 সালের 30 জুন বীরভূমির ভাগনাডিহিতে জমায়েত সাওঁতাল সমাজ তাদের সিন্ধান্ত তাদের দাবি ও অভিযোগ ইংরেজ সরকারকে জানানোর জন্য কলকাতা অভিমুখে রওনা হন,
ভারতের ইতিহাসে এটাই প্রথম গণ পদযাত্রা,
পথি মধ্যে খবর আসে বিনা অপরাধে জঙ্গি পুরের মহেশ দারোগা সেই এলাকার সুদ খোর মহাজন কেনারাম ভগৎ এর সহযোগিতায় 6/7 জন সামাজিক সাঁওতাল নেতাকে গ্রেপ্তার করে ভাগলপুরে নিয়ে যাচ্ছে,
এই খবর পেয়ে পদযাত্রায় অংশগ্রহণকারী দল মহেশ দারোগার পথ অবরোধ করে, এবং ঘটনাটি চরম পর্যায় পৌঁছালে উত্তেজিত জনতা মহেশ দারোগা ও কেনারাম ভগৎ সহ তাদের দলের 19 জনকে সেখানেই হত্যা করে, এবং হুল হুল, হলে হুল বলে শ্লোগান দেয়,
শুরু হয় ইংরেজ আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত বাহিনীর বিরুদ্ধে সাঁওতালদের সশস্ত্র যুদ্ধ,
এই বিদ্রোহে সাঁওতালদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলো কুমার, তেলি, কর্মকার, চামার, ডোম, মোমিন সম্প্রদায়ের গরিব মুসলমান ও হিন্দু জনসাধারণ,
সাঁওতাল বিদ্রোহ স্বাধীনতা ইতিহাসে প্রথম স্বাধীনতার সংগ্রাম, একই সাথে এই বিদ্রোহের মাধ্যমেই দারিদ্রতার বিরুদ্ধে, বাঁচার দাবিতে কৃষক সমাজের প্রথম গণ সংগ্রাম হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে,
সাঁওতাল নেতাদের ধরিয়ে দেওয়ার জন্য ইংরেজরা তখনকার সময়ে বিভিন্ন পর্যায়ে দশ হাজার , পাঁচ হাজার, ও এক হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছিল,
সিধু ,কানুকে ষড়যন্ত্র করে ধরিয়ে দেওয়া হয়, এবং ইংরেজরা তাদের হত্যা করে, ফলে নেতৃত্বের অভাবে এই বিদ্রোহ স্তিমিত হয়ে পড়ে
এই আন্দোলনে মহিলারাও স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে অংশ নিয়েছিল, অধিকার আদায় আন্দোলনে সেদিন সাঁওতাল মহিলারা যুদ্ধ করে প্রাণ দিয়েছিলো, ঘরের কোণে লুকিয়ে থাকেনি, বিদ্রোহে নারীদের অংশ গ্রহণ ছিল প্রত্যক্ষ ভাবে পুরুষের সহযোগী সশস্ত্র ভূমিকায়
No comments:
Post a Comment